গল্পসমূহ

‘সবাই বলেছিল সে বাঁচবে না’

অমিয়া হালদার

আফিয়ার বয়স নয় মাস এবং অপরিণত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এই শিশু মাতুয়ােইল শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে মাসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এসেছে। ১১ সপ্তাহ আগে মায়ের কোলে প্রাণোচ্ছ্বল শিশুটিকে দেখে আপনি কোনোভাবেই বলতে পারতেন না যে জন্মের পর থেকে প্রতি মাসেই তাকে হাসপাতালে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকতে হয়েছে। তার ওজন ছিল একটি বাস্কেট বলের সমান, ৮৭০ গ্রাম।

বাংলাদেশে প্রতি বছর ২৩,৬০০ অপরিণত শিশুর মৃত্যু হয়, যা অপরিণত শিশু মৃত্যুহারের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় সর্বোচ্চ এবং বিশ্বের মধ্যে সপ্তম। অপরিণত অবস্থায় জন্মগ্রহণজনিত জটিলতার কারণে বাংলাদেশে প্রতি ঘণ্টায় ৭ নবজাতকের মৃত্যু হয়।  যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা না যায়নি। তবে এ বিষয়ে গবেষণা চলছে। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এর জন্য কৈশোরে গর্ভধারণ, দু’টি সন্তান জন্মদানের মাঝে অল্প সময়ের ব্যবধান, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, যৌনবাহিত বিভিন্ন সংক্রমণ, অতীতে একই ধরনের ঘটনার ইতিহাস, এইচআইভি/এইডস, তামাকের ব্যবহার, পারিবারিক সহিংসতা ও দূষণকে দায়ী করেন।

“সবাই বলেছিল আফিয়া বাঁচবে না”- আগের কথা মনে করে বলেন তার মা শিমা ইসলাম। তিনি বলেন, ”আমার গর্ভধারণের সময়টা ছিল খুব বেদনাদায়ক। নির্ধারিত সময়ের এক মাস আগেই যখন আমার পানি ভেঙে যায়, আমরা বাচ্চার জন্মের জন্য তখন একটি অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় একটি হাসপাতালে যাই। সেখানে আফিয়ার যখন জন্ম হলো, তখন আমাদের হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল। কারণ সে ছিল খুবই ছোট, শরীর কুঁচকানো ও নীল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস প্রায় চলছিলই না।’

আসলে শিশুটি শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছিল, যা অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়ার পর যেসব কারণে শিশুদের মৃত্যু হয় তার মধ্যে প্রধানতম কারণ। তবে সৌভাগ্যজনকভাবে, এক ঘণ্টার মধ্যে তাকে শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে-এ নেওয়া হয়েছিল।  সেখানে তাকে একটি ইনকিউবেটরে রাখা হয়েছিল এবং তারা তার ফুসফুস সক্রিয় করতে পেরেছিলেন।  মাত্র ১০ দিন আইসিইউতে থাকার পরই আবার মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলন হয়েছিল তার।  এই পরীক্ষার শেষে সবকিছু ভালোই হবে- এমন আশায় তারা তার নাম রাখে আফিয়া, যার অর্থ সুস্বাস্থ্য।

তবে সে সময় তার ওজন ১.৩ কেজি থাকলেও সেটা ছিল বেশ কম এবং অপরিণত অবস্থায় কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশুরা তাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। চিকিৎসকরা শিমাকে ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ারের’ পরামর্শ দেন, যার অর্থ হচ্ছে শিশু আফিয়াকে শরীরের সঙ্গে একেবারে লাগিয়ে রেখে বহন করা। এটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা আফিয়া আইসিইউতে থাকার সময় মা-মেয়ের বন্ধন বিলম্বিত হয়েছিল।

শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে-এ ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) বাংলাদেশে এ ধরনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র, যা চালু হয় ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবর। এখন পর্যন্ত অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া ২০৬ শিশুকে এখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তারা চমৎকার ফলাফল পেয়েছে। তবে ওই কেএমসিতে মাত্র ১১ শিশুর ক্ষেত্রে এটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি; যার কারণ ছিল, হয় মা এটা গ্রহণ করেনি অথবা শিশু এটাকে গ্রহণ করেনি।  এটি যে কারণে করা হয় তা হলো,সহজ এ পদ্ধতিতে মায়ের ত্বকের সঙ্গে শিশুর ত্বক লেগে থাকায় মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে এবং এটা শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রক্রিয়ায় সহায়ক হয়।

ঝুঁকিতে থাকা সন্তান সম্ভবা মায়েদের চিহ্নিত করা

শিমার বিয়ে হয়েছিল ১৫ বছর বয়সে এবং কৈশোরেই তিনি গর্ভধারণ করেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে মা হওয়ার পাশাপাশি তিনি জটিলতায়ও ভুগছিলেন। মোট দুইবার গর্ভধারণ করে শিমা এবং উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন, যার প্রথমটি শেষ হয় গর্ভপাতের মধ্য দিয়ে। সে সময় চিকিৎসকরা তাকে সতর্ক করে বলেন, আবারও গর্ভধারণ করলে তাকে একই ধরনের জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।  তবে শিমা ও তার স্বামী আফিয়ার জন্য একটি ভাই বা বোন চান, সেটা তার বাবা বিদেশ থেকে ফিরলে, যখন আফিয়ার বয়স এক বছর পূর্ণ হবে। শিমা বলেন, “আমি ঝুঁকি সম্পর্কে জানি।  আমাকে শুধু একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে।”

অপরিণত শিশু চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সন্তান সম্ভবা মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও আগাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অপরিণত জন্মজনিত শিশুমৃত্যু কমাতে এবং নবজাতক ও শিশুদের প্রতিরোধযোগ্য সব মৃত্যু ঠেকাতে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা মায়েদের চিহ্নিত করা এবং হাসপাতালে অথবা প্রশিক্ষিত ধাত্রীর তত্ত্বাবধানে সন্তান জন্মদানে তাদের উৎসাহিত করা অপরিহার্য।

তবে শিমার মতো সব মায়ের জীবন-রক্ষাকারী এসব সেবা গ্রহণের আর্থিক সামর্থ্য থাকে না বা এসব সেবা গ্রহণের সুযোগ পায় না। এ অবস্থার অবসানে ইউনিসেফের সহায়তায় শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে কেএমসিতে জেলা হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। অন্যান্য সাশ্রয়ী, প্রমাণিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে নবজাতকের অপরিহার্য যত্ন (উষ্ণতা, পরিচ্ছন্নতা, খাওয়ানো), শুরু থেকে বুকের দুধ খাওয়ানো এবং শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যাগুলো দূর করা। এ সংক্রান্ত জটিলতা ও মৃত্যু প্রতিরোধে এসব কার্যক্রম নিয়ে মায়েদের কাছে পৌঁছানো অপরিহার্য।

আগামীর সংগ্রাম

শিমা ভালোভাবে আফিয়াকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, কেননা সে এক নার্সের কোলে যাওয়ার জন্য জোরাজরি করছে। “সে সবসময় অন্য মানুষের কোলে যাওয়ার চেষ্টা করে,” শিমা হাসে। আগামীকাল তাদের ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যাওয়ার আরেকটি দিন ধার্য রয়েছে। আফিয়ার চোখে অস্বাভাবিক রক্তনালী তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে, যা অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে একটি অতি সাধারণ জটিলতা। তবে চিকিৎসা না করালে এটি অন্ধত্ব বয়ে আনতে পারে। চিকিৎসক দেখাতে মা ও মে দু’জনকেই প্রতি মাসে ৩-৪ বার মুন্সীগঞ্জে তাদের গ্রাম থেকে ঢাকায় আসতে হয়।

মেয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি কোন জিনিসটা চান- জানতে চাইলে জবাব দিতে আফিয়ার মাকে চিন্তা করার জন্য থামতেও হয় না। “আমি চাই না সে আমার মতো হোক”- বলেন শিমা। এরপর বলতে থাকেন তার স্বাপ্নের কথা, “আমি চাই যাকে বিয়ে করবে তাকে সে নিজেই পছন্দ করুক।” মেয়ের দিকে অত্যন্ত মমতা নিয়ে তাকিয়ে থাকা তার হাসিমাখা চোখ দুটো যেন বলছে, তিনি ভীত নন। কারণ যারা অধ্যবসায়ী তারা ভালো কিছুই পান।

 
Search:
For every child
Health, Education, Equality, Protection
ADVANCE HUMANITY
Search: