গল্পসমূহ

শিশুর মস্তিষ্কে আঘাত হানে বিষাক্ত বাতাস

বেড়ে ওঠার আগেই হারিয়ে যাচ্ছে নবজাতকের বুদ্ধি বিকাশের সম্ভাবনা

 

সামিন সাবাবা

দূষিত বাতাস থেকে হয় জটিল অসুখ, যা কেড়ে নেয় অসংখ্য শিশুর প্রাণ। কিন্তু এর প্রভাব আরও অনেক গভীর ও ভয়ানক।

দূষিত নগরীর নবজাত শিশুরা আছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। কারন তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার আগেই দূষিত বাতাস তাদের মস্তিষ্কে মারাত্তক ক্ষতি করে। নতুন এই তথ্যটি উঠে এসেছে ইউনিসেফের গবেষণায়।

বায়ু দূষণ-যে নিউমোনিয়া ও যক্ষ্মার মত ফুসফুসের রোগের কারন তা আমাদের আগেই জানা। কিন্তু নবজাতকের মস্তিস্কে এর প্রভাব প্রথমবারের মত জানা গেলো ডিসেম্বরে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রে।

বাংলাদেশে যাদের বাস তাদের জন্য এটা অত্যন্ত ভীতিকর একটি তথ্য। কারন আছে অনেকগুলো।

বিশ্বের সবচাইতে দূষিত বায়ুর দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ, জানা গেছে ডব্লিউএইচও-এর ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে।

এখানে বাতাসের বিষাক্ত কণার পরিমান সহনীয় মাত্রার ছয় গুন বেশি — একই চিত্র দক্ষিণ এশিয়ার অনেকগুলো দেশে। বিশ্বজুড়ে যে ১৭ মিলিয়ন শিশু এরকম অতি বিষাক্ত বাতাসে বসবাস করে, তাদের মধ্যে ১২ মিলিয়নের বাস দক্ষিণ এশিয়ায়।

আরও একটি বিষয় হল বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৪০ ভাগই শিশু। জীবিকার চাহিদায় গ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকায় প্রতি বছর পাড়ি জমায় অসংখ্য পরিবার। তাদের অনেকের‍ই আশ্রয় হয় ঢাকার বস্তিগুলো। খোলামেলা পরিবেশে বসবাস করা এই পরিবারগুলোর শিশু ও নবজাতকরা বায়ু দূষণের কাছে অসহায়।

নগরায়নের সাথে সাথে বাংলাদেশের বায়ু দূষণের পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা। জাতিসংঘের গবেষণা মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে ৭৭ মিলিয়ন মানুষ বাংলাদেশের শহরগুলোতে বসবাস করবে।

আর শিশুদের সংখ্যায় ঢাকা থাকবে বিশ্বের তৃতীয় স্থানে, বলেছে গ্লোবাল ইন্সটিটিউটের একটি রিপোর্ট।।

কেমন করে হয় নবজাতকের ক্ষতি?

একজন নবজাতক শিশুর ওপর বায়ু দূষণের প্রভাব একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। তারা ঘন ঘন শ্বাস নেয় এবং এর কারনে আরও বেশি বিষাক্ত কণা তাদের ফুসফুসের মাধ্যমে রক্তে প্রবেশ করে এবং মস্তিস্কে আঘাত হানে। ওজন কম হওয়ায় ক্ষতি হয় আরও বেশি।

বিষাক্ত কণাগুলো আসে গাড়ির বা কলকারখানার ধোঁওয়া থেকে। যখন শহরে বিভিন্ন কাঠামো, যেমন ঘরবাড়ি বা সেতু নির্মাণ করা হয়, সেখান থেকেও হয় বায়ু দূষণ। এর কণাগুলো এতই ক্ষুদ্র যে খুব সহজেই তা ফুসফুসের দেয়াল পেরিয়ে রক্তে প্রবেশ করে।

এই বিষক্রিয়া ঘটতে পারে মায়ের গর্ভেও, যদি ক্ষতিকর কণাগুলো প্ল্যাসেন্টা পাড়ি দিয়ে শিশুর মস্তিস্কে প্রবেশ করে। এই শিশুদের জন্মের তিন বছরের মাথায় বৃদ্ধি বাধাগ্রস্থ হয়। বড় হয়ে এরা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়, যেমন বিষণ্নতা ও অতি মাত্রায় দুশ্চিন্তা।

এখানেই শেষ নয় মারাত্মক রোগের তালিকা। নবজাতক যদি দূষিত বাতাসের মধ্যে বেড়ে ওঠে তাহলে হতে পারে আলঝাইমারস, পারকিন্সনস, অ্যাসপারগার সিন্ড্রোম, এডিএইচডি, ক্যান্সার ও হৃদরোগ।

আরও নষ্ট হয় তাদের চেতনা, শিক্ষা ও পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা। কমে যায় আইকিউ ও স্মৃতিশক্তি।

“এই শিশুরা পরীক্ষায় ভালো করতে পারে না এবং এর ফলে অন্যদের তুলনায় কম জিপিএ অর্জন করে বলে গবেষণায় প্রমানিত,” বলা হয় ইউনিসেফ-এর গবেষণাপত্রে।

“একটি শিশুর জন্মের প্রথম একহাজার দিনে তাদের বিকাশের ভিত তৈরি হয়। এই সময়ে অপুষ্টি, অবহেলা আর সহিংসতা যেমন ক্ষতিকর, তেমনই ক্ষতিকর দূষিত বাতাস।”

এসব থেকে বাঁচার উপায় কি?

দূষিত বায়ু যেখানে সেখান থেকে শিশুদের যথাসম্ভব দূরে রাখুন। বিষাক্ত বাতাসের মধ্যে যেকোনো ভারী কাজ, খেলাধুলা অথবা শারীরিক চর্চা থেকে বিরত রাখুন। শিশুর শ্বাসকষ্ট থাকলে এরকম পরিবেশ থেকে দূরে আরও নিরাপদে রাখুন। প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করুন।

বাংলাদেশের শহরগুলোতে বেড়ে ওঠা শিশুরা বাধ্য হয়ে রাস্তাঘাটের নোংরা পরিবেশে খেলাধুলা করে। এটা তাদের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক। তাই বড়দের উচিত তাদের জন্য স্মার্ট ও পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলা। যার মাঝে থাকবে পর্যাপ্ত পরিমাণ সবুজ উদ্যান।

মায়ের দুধ নবজাতককে নিয়মিত পান করালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং তার শরীর নিউমনিয়া ও ব্রংকাইটিসের মত অসুখ ও পরিবেশের বিভিন্ন ক্ষতিকারক উপাদান থেক সুরক্ষিত থাকে। বাতাসে দূষণের পরিমাণ সময় ও আবহাওয়ার কারনে খুব দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে, তাই একে মাপতে ব্যাবহার করতে পারেন পরিধানযোগ্য বিভিন্ন এয়ার কোয়ালিটি ট্র্যাকার।

যানবাহন ও কলকারখানাগুলো যাতে বিষাক্ত ধোঁওয়া বাতাসে না ছাড়ে তার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। এর জন্য সোলার, বাতাস ও থার্মাল শক্তি ব্যাবহারে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন। বর্জ্য ব্যবস্থা পরিকল্পনার আওতায় এনে এগুলো বিভিন্ন স্থানে আগুনে পোড়ানো বন্ধ করতে হবে।

শিশুদের দূষণ সম্বন্ধে শিক্ষা দান প্রয়োজন। যাতে তারা নিজেরা সুরক্ষিত থাকতে পারে এবং পরিবেশ সংরক্ষণের সব নিয়ম অনুসরণে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

 
Search:
For every child
Health, Education, Equality, Protection
ADVANCE HUMANITY
Search: