গল্পসমূহ

প্রকৃতির ডাকেও সাড়া দিতে যখন সাহস লাগে

এন সোফি বোনফিল্ড

মিয়ানমারে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মেয়ে ও নারীদের জন্য বাংলাদেশে একটি শরণার্থী শিবির নিরাপদ আশ্রয়স্থলই হওয়ার কথা। কিন্তু তাদের দৈনন্দিন জীবন এবং টয়লেট ব্যবহারের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা সব সময় সহজ নয়।

মানবিক জরুরি পরিস্থিতিতে স্যানিটেশনের জন্য নিরাপদ স্থানের অভাব এবং মেয়ে ও নারীদের অসহায়ত্বের বিষয়টি প্রায় সময়ই নজর এড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের কক্সবাজারে ক্রমবর্ধমান রোহিঙ্গা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসকারী দুই রোহিঙ্গা মেয়ে- ১৩ বছরের সমজিদা ও ১৪ বছরের জেসমিন আশ্রয়কেন্দ্রে স্পর্শকাতর এই বিষয়টি নিয়ে কিছু বলতে রাজি হয়।

গত বছর মিয়ানমারে বর্বর সামরিক অভিযান ও নির্মম সহিংসতার পর নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সাড়ে ৬ লাখেরও বেশি শরণার্থীর সঙ্গে তারা দু’জন পালিয়ে এসে বাংলাদেশের কক্সবাজারের জনাকীর্ণ বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। সহিংসতার সময় জেসমিন তার বাবা-মার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তার বোনের সঙ্গে পালিয়ে সীমান্ত পাড়ি দেয়। সে তার বাবা-মার কোনো খোঁজ জানে না এবং এখন সে তার মিয়ানমারের গ্রামের পরিচিত এক প্রতিবেশির সঙ্গে থাকে। সমজিদা তার ১৫ বছর বয়সী ভাইয়ের সঙ্গে থাকে। সে বার্মিজ সেনাবাহিনীকে তার বাবা-মাকে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছে।  সমজিদার ধারণা, তার বাবা-মা আর বেঁচে নেই।

এই ঘটনার পটভূমিতে ছোট এই দুই মেয়ে তাদের নতুন জীবনে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে; যে ঘটনাকে বিশ্বে ‘সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল মানবিক সংকট’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। আজ এই মেয়েদের দৈনন্দিন জীবন কাটে তারা যে সরু ধূলিময় পথের জীর্ণ বাঁশের কুঁড়েঘরে থাকে সেটাকে কেন্দ্র করে; দৈনন্দিন কাজকর্মে সাহায্য করে এবং শিক্ষাকেন্দ্র ও কিশোরী ক্লাবে অংশগ্রহণ করে। ইউনিসেফ এসব শিক্ষাকেন্দ্র ও কিশোরী ক্লাব স্থাপন করেছে শিশু ও কিশোরীদের একটি সুরক্ষামূলক পরিবেশ প্রদানে এবং শারীরিক ও মানসিক আঘাতের মাঝেও তাদের স্বাভাবিকতার একটি ধারণা দিতে।

গোপনীয়তা ঝুঁকিতে

রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় জনাকীর্ণ একটি আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদ টয়লেটের মতো মৌলিক সেবাসমূহ প্রদান করা সহজ থাকেনি। সমজিদা ও জেসমিন জানায়, ল্যাট্রিনে যাওয়ার সময় গোপনীয়তার বিষয়টি খুব সামান্যই মাথায় থাকে, যদিও দরজায় একটি তালা রয়েছে। তাছাড়া এখানে সর্বত্রই পুরুষ মানুষের বিচরণ। আর কিশোরী মেয়েদের কুঁড়েঘরের নিকটবর্তী ল্যাট্রিনগুলো নারী-পুরুষ সবাই ব্যবহার করে। সমজিদা চায় ল্যাট্রিনগুলো পুরুষ ও নারীদের মধ্যে আলাদা করে দেওয়া হোক। তবে আশ্রয়কেন্দ্রের মাত্র কয়েকটি স্থানেই সেটা করা হয়েছে। এমনকি যেখানে পরিষ্কারভাবে নারী ও পুরুষের ল্যাট্রিন চিহ্নিত করা আছে, সেখানেও পুরুষরা প্রায়ই নারীদের জন্য নির্ধারিত ল্যাট্রিন ব্যবহার করে।

সমজিদা বা জেসমিনের কেউই ল্যাট্রিনগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগ করেনি, যদিও সমজিদা যে ল্যাট্রিনটি ব্যবহার করে সেটার প্রকট দুর্গন্ধ। আসলে এখানে অনেক মানুষকে একই ল্যাট্রিন ব্যবহার করতে হয় এবং এক্ষেত্রে ল্যাট্রিনটি সব সময় পরিষ্কার রাখাও বেশ কঠিন। কিন্তু যে বিষয়টি এই মেয়ে দু’টি আলোচনা করতে চায় তা হচ্ছে, রাতের বেলায় যখন তাদের বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তখন তারা কি করে। ওই মুহূর্তটি তাদের দু’জনের জন্যই ভয় ও উদ্বেগের।

ভয়ের কারণসমূহ

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সমজিদা জানায়, এটা তাকে ভীত করে তোলে। অন্ধকারে ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় তার সেই ভয়ের অনুভূতি ফিরে আসে; যে ভয় সে পেয়েছিল মিয়ানমারে তার গ্রামে সেনাবাহিনী আক্রমণ করার সময়। মেয়েদের ধর্ষিত ও গুলিবিদ্ধ হতে দেখার কথা জানায় সমজিদা। যদিও মাত্র কয়েকটি ঘর পার হয়েই তাকে ল্যাট্রিনে যেতে হয়, তারপরও অন্ধকার পথে হেঁটে ল্যাট্রিনে পৌঁছানোটা তার কাছে বিপজ্জনক মনে হয়। মনে হয় যেন তাকে তাড়া করতে সেই আতঙ্ক ফিরে আসছে। সে জানায়, একটি টর্চ লাইট নিয়ে কোনোরকম সে ল্যাট্রিনে যায়; যে টর্চ লাইটটি সে পেয়েছে ইউনিসেফ থেকে।

জেসমিনের জন্য বিষয়টি, সে যেমনটা বলে ‘ভূতের’ ভয়; যা রাতের বেলায় ওত পেতে থাকে। এই ভূতগুলো আসলে কি তার ব্যাখ্যা সে দিতে পারে না। তবে ভয়টা এতই জোরালো যে রাত নামার পর তার যদি একা বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে সে যায় না। যদি কোনো বন্ধু বা বড় কেউ তার সঙ্গে থাকে তবেই সে সেখানে যায়। বালুখালি ক্যাম্পের রাত সাধারণভাবেই খুব অন্ধকার এবং তার ভীতি দূর করার জন্য সেখানে আলোর কোনো ব্যবস্থা নেই।

উন্নয়ন খোঁজা অব্যাহত

মেয়ে ও নারীদের যখন বাথরুমে যাওয়ার এবং গোসল করার প্রয়োজন হবে, তখন তারা যাতে নিরাপদ বোধ করে তা নিশ্চিত করতে কঠোর পরিশ্রম করছে ইউনিসেফ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ইউনিসেফ কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে ১৭ হাজারেরও বেশি ল্যাট্রিন নির্মাণ করেছে। নারী ও মেয়েদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়েই এগুলোর নকশা করা হয়েছে। মেয়ে ও নারীরা যাতে তাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে এবং নিরাপদ অনুভব করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য বেশ কিছু সংখ্যক ‘গোসল খানা’নির্মাণ করা হয়েছে।

জনাকীর্ণ ক্যাম্পে হাজার হাজার মানুষের মাঝে সমজিদা ও জেসমিনের মতো মেয়েরা যাতে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির সুবিধা পায় তা নিশ্চিত করাই এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তবে ইউনিসেফ ও তার অংশীদাররা অসহায় এই ছোট মেয়েগুলোর জন্য যতটা সম্ভব ভালো ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

 
Search:
For every child
Health, Education, Equality, Protection
ADVANCE HUMANITY
Search: