গল্পসমূহ

‘বড় হয়ে ওঠা’ শিশুটি

সামিন সাবাবা

রোকেয়া যখন গন্তব্যস্থলে পৌঁছায় তখন সে ধুলায় প্রায় ঢেকে গিয়েছিল।

১৩ বছর বয়সী এই রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু জানায়, বালুখালী শিবিরের ভেতর এক ঘণ্টা ধরে হাঁটছিল সে।

মিয়ানমারে সহিংসতা থেকে বাঁচতে পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আসা শরণার্থীদের জন্য অস্থায়ী যে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে, কয়েক হাজার একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই ক্যাম্প তারই একটি।

রোকেয়া সরু বাহুতে বহন করছিল তার মৃত ভাইয়ের শিশু কন্যা রাহেজান বিবিকে, যে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

মিয়ানমার থেকে নতুন করে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের প্রায় ৬ শতাংশই এমন মারাত্মক অসুস্থতায় ভুগছে। তাই শিশুটির ছোট্ট ফুফু তাকে ইউনিসেফের পুষ্টি কেন্দ্রের দিকে নিয়ে যায়।

আউটপেশেন্ট থেরাপিউটিক প্রোগ্রাম বা ওটিপিতে তাদের এ নিয়ে দ্বিতীয়বার ভর্তি হতে হয়।

রোকেয়া তার মৃত ভাইয়ের শিশু কন্যা রাহেজান বিবিকে, যে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, থেরাপিউটিক ফুড বা আরইউএফটি খাওয়াচ্ছে।

নিজের ভ্রুজোড়া কুঁচকে রোকেয়া বলে, ‘এখন আমি রাহেজানের দেখাশোনা করছি। তিন দিন আগে তার মা আরেকটি মেয়ের জন্ম দেয়। তারা এখনও ক্যাম্পের হাসপাতালে রয়েছে।’

পুষ্টি কর্মীরা রোকেয়াকে দেখাচ্ছিল কীভাবে রাহেজানকে ‘প্লাম্পি নাট’ খাওয়াতে হবে, যা ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা একটি থেরাপিউটিক ফুড বা আরইউএফটি।

ইউনিসেফ সেন্টারে তাকে সেবা প্রদানকারী জানায়, উচ্চ-শক্তি, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সমৃদ্ধ এই মিশ্রণ আগামী তিন সপ্তাহে দেড় বছর বয়সী শিশুটিকে তার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।

রাহজান কাঁদে, কিন্তু তার ফুফু ধৈর্য ধরে তাকে ওই মিশ্রণ খাওয়াতে থাকে এবং খাবার গিলতে যাতে সুবিধা হয় সেজন্য চামচ দিয়ে তাকে অল্প অল্প পানি খাওয়ায়। রোকেয়া জানায়, দ্রুত তাদেরকে আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরতে হবে কারণ তাকে তার পরিবারের জন্য রান্না করতে হবে।

দুর্দশা ও বোঝাক্রান্ত হলেও সে কথা বলছিল একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতোই, ‘হ্যাঁ, তাকে দেখাশোনা করা অনেক কষ্টের। কারণ আমাদের খাওয়ার মতো পর্যাপ্ত খাবার নেই।’

রাখাইনের বুথিডংয়ের দারগাপাড়া থেকে আসা রোকেয়ার পরিবারে এখন সদস্য সংখ্যা আটজন; তার মা, বাবা, এক খালা ও তার বাচ্চা, ভাবী ও তার সদ্যজাত সন্তান। রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলোকে লক্ষ্য করে সেনাবাহিনীর নৃশংসতার সময় তার ভাই নিহত হয়।

‘আমার মা সবসময়ই অসুস্থ থাকে। তার জ্বর হয় এবং সারা শরীরজুড়ে ব্যথা থাকে। তাই রাহেজানকে দেখাশোনা করতে তিনি সবসময় আমাকে সাহায্য করতে পারেন না।’

রোকেয়া বলে, ‘মিয়ানমারে থাকাকালে আমি ঘরে টুকিটাকি কাজ করতাম, কিন্তু এখন আমি সবসময়ই কাজ করি… রান্না করি, পানি আনি ও রাহেজানের দেখাশোনা করি।’

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু ভেবেছে কিনা জানতে চাইলে সে বেশ নির্লিপ্তভাবে চুপ থাকে। কিছু সময় পরে সে জবাব দেয়, ‘আমার লেখাপড়া করতে ইচ্ছা করে।’

শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ইউনিসেফের সহায়তাপ্রাপ্ত শিক্ষা কেন্দ্র ও শিশুবান্ধব স্থানগুলো (সিএফএস) রোহিঙ্গা শিশুদের দিয়ে কানায় কানায় ভরে গেছে। তবে রোকেয়ার মা তাকে সেখানে যেতে দেয় না।

‘সিএফএস আমাদের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে। এছাড়া মা মনে করে, আমার কেবল ক্যাম্পের মাদ্রাসায় (ধর্মীয় বিদ্যালয়) যাওয়া উচিত। আমি মাঝে মাঝে সেখানে যাই।’

অনেক রোহিঙ্গা কিশোরীকে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতেই উৎসাহিত করে তাদের বাবা-মা। রোকেয়া জানায়, এখন যেহেতু সে ‘বড় হয়েছে’, ‘এত অপরিচিত মানুষের’ মাঝে থাকতে তার ‘অস্বস্তি’ লাগে।

আরো অনেক শিশুকে দেখা গেলে তাদের চেয়েও ছোট শিশুদের পুষ্টি কেন্দ্রে নিয়ে যেতে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের একজন তাহমিনা বলেন, ‘আমরা মায়েদের বলি যাতে তারা নিজেরাই সেশনগুলোতে আসে। কেউ কেউ কথা শোনেন, তবে কেউ কেউ আবার শোনেন না।’

তিনি বলেন, ‘তারা প্রথমবার ভর্তির জন্য আসেন। তবে পরবর্তী সেশনগুলোর জন্য তারা তাদের অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুটিকে আরেক সন্তানের সঙ্গে পাঠায়। কারণ মায়েদের ঘরের টুকিটাকি কাজ করতে হয় অথবা ত্রাণের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়।’

পুষ্টি কেন্দ্রের কর্মীরা এক সপ্তাহজুড়ে রাহেজান বিবিকে খাওয়ানোর জন্য ‘প্লামি নাট’ ভর্তি একটি ব্যাগ রোকেয়ার হাতে তুলে দেয়। সে চুপচাপ ব্যাগটি নেয়, রাহেজান বিবিকে কোলে তোলে এবং দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে যায়।

যাওয়ার সময় মাটির দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করতে থাকে, ‘আমাকে দ্রুত ফিরে যেতে হবে। আমাকে রান্না করতে হবে।’

#

 
Search:
For every child
Health, Education, Equality, Protection
ADVANCE HUMANITY
Search: