গল্পসমূহ

বড় হওয়ার সময় যত ঝামেলা

সামিন সাবাবা

বড় হওয়াটা আসলেই অনেক গোলমেলে! গল্পটা শুরু করা যাক নিজেকে দিয়েই।

বয়স ১১ পার হওয়ার আগে আমি ছিলাম খুবই শান্ত। মায়ের বাধ্য তাই কাছে কাছে থাকি। এই সময়ে আমাকে আদর করে ডাকা হত লজ্জাবতী। এখন হয়তো কারো বিশ্বাস হবেনা!

নামটা শেষ পর্যন্ত কপালে টেকেনি। এক বছরের মাথায় আমার আচরণ অনেক বদলে গেল। আগে সকাল সন্ধ্যা মারের ভয় পেতাম কারন মায়ের স্বাভাব ছিল চট করে রেগে যাওয়া।

কিন্তু সব উলটে গেল। মার খাওয়ার ভয় কেটে গেল। মায়ের সাথে যেকোনো বিষয়ে তর্ক করাটাই হয়ে দাঁড়াল আমার প্রধান কাজ। কেউ সমালোচনা করলে, বেঁকে বসতাম আরো।

কারন ছোট হলে কি, সব বিষয়েই কিছু বলার আছে আমার। অনেক অতিথিরা এটা বুঝত না। ছোট বলে ‘লেকচার’ কানে নিতো না। দিতাম বলে একটা ত্যারা কথা। এই শুরু লঙ্কাকাণ্ড।

আবার অনেকে ছিল যারা শুনতো। মন দিয়ে আমার আঁকা ছবিগুলো দেখতো। আমার কবিতাগুলো পড়তো। সেগুলো নিয়ে আলোচনাও করতো। আমি অপেক্ষা করতাম এরকম অতিথিদের জন্য। যারা নতুন নতুন বিষয়ে আমার সাথে গল্প করে। ছোটদেরও যারা সম্মান করে, তাদের সাথে আবার তর্ক কিসের ?

কিন্তু তাও আমার নাম বদলে হল ফুলন দেবী — দুর্ধর্ষ সেই দস্যূ রানী। আনেকেই কিন্তু এটা জানেনা। ছোটদের এরকম কড়া খেতাব দেওয়া একদম ঠিক না। শিশুর দোষ কি তার পরিচয় হতে পারে?

বড়দের করা মন্তব্য এ বয়সের শিশুদের ওপর অনেক প্রভাব ফেলে। আমার মন তখনো নরম, সবে মাত্র তৈরি হচ্ছে। বড়দের মত তর্ক করি ঠিকি, কিন্তু ওরা দস্যূ ডাকলে নিজেকে তাই মনে হত।

বয়স ১৩ থেকে ১৯ মাঝে শিশুদের বয়ঃসন্ধিকাল। এসময় তারা মত প্রকাশ করবে, বড়দের কথার বিরোধিতা করবে, মাঝে মাঝে ভুল ধরিয়ে দেবে, এটাই স্বাভাবিক।

এসময় বদলে যায় তার শরীর ও আচরণ। হয় মন আর মস্থিস্কের গঠন, তাই সময়টা খুব নাজুক। বয়ঃসন্ধিকাল পেরচ্ছে এমন শিশুর সাথে যে ব্যাবহার করবেন, সেটাই ওর আচরণে প্রতিফলিত হবে। এটা সব ছেলেমেয়েদের জন্য সত্য।

কিন্তু দুষ্টুমি তো দূরের কথা, আমার অনেক বন্ধুদের, বিশেষ করে মেয়েদের স্বাভাবিক মত প্রকাশের অধিকার ছিলনা। বড়রা বলবে, আর শিশুরা শুনবে – এই পুরনো রীতি এখনও চলে অনেক পরিবারে। মেয়ে শিশুদের কথা বলব, কারন ওদের ওপর চাপ দ্বিগুণ।

এখন হয়ত কোন মা-বাবা আমাকে বলবেন, “মেয়েদের শাষন না করলে খারাপ হয়ে যাবে। আপনার মত ‘দস্যিও’ হয়ে যেতে পারে! বাঙালি মেয়েদের থেকে এরকম মেনে নেওয়া যায় না।”

সেক্ষেত্রে যেনে রাখা ভালো যে এ নাজুক সময়ে শিশুর মত প্রকাশে বাধা দিলে, তার কথাগুলোকে ব্যাঙ্গ করলে, তার নিজস্ব ভাবনাগুলো দুর্বল হয়ে যায়। সে মন গুটিয়ে ফেলে।

ছোটবেলায় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলে বড় হয়ে তারা নিজেদের ও অন্যদের ওপর আস্থা রাখতে পারে না, এটা প্রমানিত গবেষণায়।

কে দেবে ওকে সুযোগ আর ভরসা? 

আমাদের শহর ও মফস্বলের বেশিরভাগ মেয়েরা বেড়ে ওঠে চার দেওয়ালের মাঝে। ছেলেরা বাড়ির বাইরে খেলতে বের হয়ে, নিজ বয়সীদের সাথে মেশে ও আড্ডা দেয়। চিনতে শেখে রাস্তাঘাট, তার নিজ এলাকা ও পরিবেশ। মেয়েদের সেই সুযোগ নেই। কিন্তু তার এগুলোর খুব প্রয়োজন আছে।

খেলাধুলা মানে শরীর ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা। এ সময়ে যে হরমোনগুলোর কারনে শিশুর শরীরে পরিবর্তন আসে, সেগুলোর প্রভাবে সে বিষণ্ণ হয়ে পরে। মেজাজ থাকে খিটখিটে, আর মন স্পর্শকাতর।

“আমাদের দেশে মা-বাবারা শিশুদের বিষয়ে নির্বিকার না। শিশুদের মধ্যে বিষণ্ণতার চিহ্ন ধরতে পারলেও, এই অসুখের পেছনের কারনগুলো সম্বন্ধে জানে না। বিষণ্ণতার রোগী দিনে দিনে বাড়ছে। শহরে এত স্কুল, কিন্তু কোন খেলার মাঠ নেই,” বলেন মনোবিজ্ঞান অধ্যাপক ডঃ মোহাম্মাদ কামাল উদ্দিন।

“ছেলেদের তাও ঘরের বাইরের আরেকটা জগত আছে। কিন্তু মেয়েদের তাও নেই। এক মাত্র বিকল্প সামাজিক মাধ্যম ও এর আসক্তি,” বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।

শরীরচর্চা এ সময় অবশ্যক, কারন এতে শরীরে হরমোন ‘সেরোটনিনের’ পরিমান বাড়ে। আমাদের ভালোলাগা, ইতিবাচক অনুভূতিগুলো তৈরি করে এই সেরোটনিন।

বয়ঃসন্ধিকালে মেয়ে শিশুর শরীর নারীর আকার নিতে থাকে। শুরু হয় বড়দের মত সব শারীরিক প্রক্রিয়া, যেমন মাসিক। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গজায় চুল।

আশেপাশের অনেকেই এইসময় তার শরীরটিকে অন্য দৃষ্টিতে দেখছে, এটা তার মধ্যে অসস্থি তৈরি করে। কারন সে নিজ মনে একজন শিশু। তাই এইসব বদলে যাওয়া তাকে লজ্জিত করে, ভড়কে যায়।

আমাদের সমাজ, এমনকি উন্নত বিশ্বেও, মেয়েদের শরীরকে ঘিরে চলে অনেক অন্যায় কাজ ও চিন্তা। এই বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার চাপ প্রত্যেকটি মেয়ে শিশু অনুভব করে। এটা আরও তীব্র হয় বয়ঃসন্ধিকালের সময়ে। তাই আমাদের দেশের মেয়েরা নিজের যৌনতাকে ভয় করে।

যৌনতা শরীরের একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এতে লজ্জার কিছু নেই, শিশুদের এই শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সবার — পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, সমাজ ও সরকারের।

যৌনতা, স্বাভাবিক মূল্যবোধ এবং অনিরাপদ দৈহিক মিলনের ঝুঁকিগুলো ওকে বুঝিয়ে বলুন। অস্বস্থি ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করুন। যৌনতার বিষয়ে মা-বাবার, বড় ভাইবোনেদের উচিত শিশুর আস্থা অর্জন করা।

ওর বড় হওয়ার বিষয়ে আপনাকে স্বাভাবিক দেখলে আপনার মেয়ে শিশু তার শরীরের বদলে যাওয়াকে ভয় করবে না। কোন বিপদে, বা অসুখে ও আপনার কাছে সাহায্য চেতে পারবে।

অকারনেই যত অন্যায়

অনেকে আছেন মেয়ে শিশুদের অবহেলা করেন। যদিও সে একজন ছেলে শিশুর তুলনায় কোন দিক থেকে কম না। এমনকি তারা ছেলেদের আগে অনেক কিছু বুঝতে শেখে।

মেয়ে শিশুদের বয়ঃসন্ধি শুরু হয় ছেলেদের ১০ থেকে ১২ মাস আগে, বলা হয়েছে ইউনিসেফের গবেষণায়। একি বয়স হলেও বয়ঃসন্ধির মেয়েরা হয় কম উচ্ছৃঙ্খল। এর মানে এই না যে মেয়েরা দুরন্ত হয়না। তাদের মানসিক বিকাশ ছেলেদের চেয়ে একটু এগিয়ে।

এক সাথে বড় হয়েও, অনেক কারনে বয়সন্ধিকালে ছেলে আর মেয়েদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।

ছেলে হতে হলে মেয়েদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে হবে — এরকম অনেক ভুল ধারনা দিয়ে সৃষ্টি হয় বৈষম্য। বড়দের দেখাদেখি উঠতি বয়সের ছেলেরা অনেক সময় তাই শেখে।

এরকম হীনমন্যতার মাঝে মেয়েরা বড় হলে সমাজেরই ক্ষতি। শাষণ করতে গিয়ে শরীরে আঘাত করবেন না। এই বয়সের শিশুদের অপমান বোধ অনেক তীব্র।

বয়ঃসন্ধিকালে মনের ওপর বেশি চাপ দিলে হীতে বিপরীত হতে পারে। এ বয়সে মাদকের ওপর নির্ভরতা বা অন্য কোনো খারাপ অভ্যাসের দিকে গেলে, সেটা ছাড়ানো হবে অনেক কঠিন।

 
Search:
For every child
Health, Education, Equality, Protection
ADVANCE HUMANITY
Search: