গল্পসমূহ

বাংলাদেশে কম ওজন নিয়ে যেসব শিশু জন্মলাভ করছে তাদের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে বেশ উন্নতি হচ্ছে

সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ কী এবং বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কেন?

জন্মের সময় কম ওজন বাংলাদেশে সদ্য ভূমিষ্ট শিশুর মৃত্যুর অন্যতম কারণ । কম ওজনের শিশুর হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত  হবার ঝুঁকি অনেক বেশি।  সদ্যভূমিষ্ট এসব ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং তাদের জন্য তাপ প্রতিরোধ কৌশল ব্যবহারও বেশ জটিল। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ইউনিসেফ যৌথভাবে মা ও শিশুবান্ধব সেবা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের পাঁচটি সেবাকেন্দ্রে মা ও সদ্যভূমিষ্ট শিশুর স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নে এ উদ্যোগটি পরিচালিত হচ্ছে । বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউণ্ডেশন এ উদ্যোগটির জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে।

বাংলাদেশে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুর শরীরের তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত পরিমাপ করা হয়- বিষয়টি এমন নয়। এছাড়া হাসপাতালগুলো তাপমাত্রার চার্টও সরবরাহ করে না, যে কারনে চার্টগুলো সদ্যভূমিষ্ট শিশুর বিশেষ সেবা ইউনিটগুলোতেও (এসসিএএনইউ-স্ক্যানু) ব্যবহার হয় না। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে কুড়িগ্রাম জেলা  হাসপাতাল ৪ (চার) সপ্তাহের মধ্যে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুর তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের হার শূণ্য থেকে ১০০ শতাংশে উন্নীত করার উচ্চাকাঙ্খী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। গুণগত মানোন্নয়ন এ্যাপ্রোচ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ’কুড়িগ্রাম জেলা হাসপাতাল মানোন্নয়ন দল’ তিন সপ্তাহের মধ্যে অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে এবং  তাপমাত্রা পরিমাপের সার্বজনীন কাভারেজের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হয়।

কুড়িগ্রাম জেলা হাসপাতালের সদ্যভূমিষ্ট শিশুর বিশেষ সেবা ইউনিটে (এসসিএএনইউ) সদ্যভূমিষ্ট শিশুর তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছে

মাত্র একশ’ রোগীর ধারণ ক্ষমতা নিয়ে কুড়িগ্রাম জেলায় একমাত্র জেলা হাসপাতালে শিশুর বিশেষ সেবা ইউনিট (স্ক্যানু) রয়েছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে ডাক্তার ও নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীগণ ইউনিসেফ ও সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ফাইভএস-পিডিসিএ’ শীর্ষক এক কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে। ‘ফাইভএস-পিডিসিএ’ এ্যাপ্রোচটি হলো ’পরিকল্পনা-কাজ-যাঁচাই-করনীয়’ এবং যা বিভিন্ন দলকে ‘বাছাই করা, শৃংখলা আনা, পরিস্কার করা, মান নিয়ন্ত্রণ করা ও আত্ম-শৃংলার অনুশীলন’ এর ক্ষেত্রে সাহায্য করার দিক-নির্দেশনা দেয়।

ইউনিসেফের কারিগরী সহায়তায় কুড়িগ্রাম জেলা হাসপাতালের সদ্যভূমিষ্ট শিশুর বিশেষ সেবা ইউনিটের কর্মকাণ্ড উন্নয়ন দল সদ্যভূমিষ্ট শিশুর সেবার মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় এবং হাসপাতালটি টার্গেট পূরণ করে সমস্যা সমাধানও করে। কুড়িগ্রাম জেলা হাসপাতালের সদ্যভূমিষ্ট শিশুর বিশেষ সেবা ইউনিটের কর্মকাণ্ড উন্নয়ন দল সমস্যা থেকে উত্তোরণে সমাধানকেন্দ্রিক লক্ষ্য ও কর্মপন্থা নির্ধারণে সক্ষম হয়েছিল।

 এই এ্যাপ্রোচ এবং এর পরিমাপের সূচকসমূহ

একজন শিশু বিশেষজ্ঞের (নবজাতকের জন্য) সহায়তায় কার্যক্রম উন্নয়ন দল প্রক্রিয়া, মানুষ, স্থান এবং নীতি- এই চার ভাগের সমন্বয়ে গঠিত ফিসবোন ডায়াগ্রামের মাধ্যমে তাপমাত্রা পরিমাপের সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা চিহ্ণিত করে । মানব সম্পদের ঘাটতি, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী ও মায়েদের অনুপ্রেরণার অভাব, এবং তাপমাত্রার চার্ট এর স্বল্পতা ছিল প্রধান প্রতিবন্ধক। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যক্রম উন্নয়ন দল চার স্তরের সম্ভাব্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল-

১. কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশুর তাপমাত্রা পরিমাপের একটি ফ্লো- চার্ট তৈরি

২. তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য মা, স্টাফ নার্স ও স্বাস্থ্য সহকারীদের অনুপ্রেরণা দেয়া

৩. মানব সম্পদ বাড়াতে স্বাস্থ্য সহকারীদের অনুপ্রেরণা প্রদান

৪. তাপমাত্রা চার্টের সার্বক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষ/পরিচালকের সাথে আলোচনা করা।

উপরোক্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি বিশ্লেষণের জন্য দুটি পরিমাপক সূচক চিহ্নিত করা হয়েছিল-

  • প্রক্রিয়া সূচক- কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া শিশু যাদের তাপমাত্রা একটি তাপমাত্রা চার্টের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয় তাদের অনুপাত
  • ফলাফল সূচক- কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া শিশু যাদের হাইপোথার্মিয়া রয়েছে তাদের সংখ্যা

কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং অগ্রগতি পর্যালোচনা

প্রথমত, কার্যক্রম উন্নয়ন দল প্রথমে হাসপাতালে কর্মরত শিক্ষানবীশ স্বাস্থ্য সহকারীদের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। শিশুর বিশেষ সেবা ইউনিটে কর্মরত ছিলেন এমন চার অথবা পাঁচজন স্বাস্থ্য সহকারী শিশুর তাপমাত্রা পরিমাপ করা এবং তার রের্কড সংরক্ষণের জন্য নার্সদের সহায়তা দিত।

দ্বিতীয়ত, কার্যক্রম উন্নয়ন দল তাপমাত্রা পরিমাপের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে স্টাফ নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী ও শিশুর মায়েদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। প্রতিদিন সকালে দশ মিনিট করে নবজাতক শিশুদের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব মায়েদেরকে বুঝানো হতো। এছাড়াও নার্স ও স্বাস্থ্য সহকারীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য পৃথক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এসব পরিবর্তনের বাস্তবায়নের উপর ভিত্তি করে শিশুর বিশেষ সেবা ইউনিটে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল।

তৃতীয়ত, কার্যক্রম উন্নয়ন দল তাপমাত্রা চার্ট সরবরাহের স্বল্পতার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানায়। এর ফলে হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক একজন স্টোরকিপার ও একজন পরিসংখ্যানবিদকে ভাণ্ডার নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ এবং চার্টের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেয়। নির্দিষ্ট স্থানে না রাখা পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে নার্স ও স্বাস্থ্য সহকারী নিজেরা কাগজ কিনে এবং চার্ট ফটোকপি করে সহায়তা করত।

এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নের এক সপ্তাহ পর গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেল যে, কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া ১২ জন শিশুর মধ্যে ৩ জন হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত। আরো ভাল ফলের জন্য কার্যক্রম উন্নয়ন দলটি অনেক কিছু করতে চেয়েছিল । শিশুর বিশেষ সেবা ইউনিটে প্রতিটি শিফটেই যেন পর্যাপ্ত তাপমাত্রার তালিকা (চার্ট) থাকে সে বিষয়টি নিশ্চিতের জন্য একজন নার্সকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এ উদ্যোগের তিন সপ্তাহ পর কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া সব শিশুই পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছিল।

এই ফলপ্রসূ কার্যক্রমকে ধরে রাখতে, স্টাফরা তাপমাত্রা পরিমাপ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কার্যক্রম উন্নয়ন দলের সভায় আলোচনা করে। তারপর সাপ্তাহিক (অথবা মাসিক) সভায় এ সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে। তাপমাত্রা পরিমাপের অভ্যাস শিশুর বিশেষ সেবা ইউনিটে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আদর্শ পরিচালন পদ্ধতি হিসাবে অন্তর্ভূক্ত হচ্ছে।

ফলাফল ও আগামীর পথ চলা

এসব কার্যক্রমের ফলে কার্যক্রম উন্নয়ন দল মাত্র ৪ (চার) সপ্তাহের মধ্যে কম ওজন নিয়ে জন্মলাভ করা শিশুদের তাপমাত্রা পরিমাপের হার শূণ্য থেকে ১০০ শতাংশে উন্নীত করেছিল যা কার্যক্রম উন্নয়ন দলকে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করেছিল।শিশুর ‍বিশেষ সেবা ইউনিট উনিশ সপ্তাহ পর্যন্ত উদ্যোগগুলোর ফলাফল ধরে রাখতে পেরেছিল। কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া এরূপ ১৮০ জন ভর্তিকৃত শিশুর প্রায় ১৪০ জনকে হাইপোথার্মিয়া আক্রান্ত বলে সনাক্ত করা হয়েছিল এবং তাদের সঠিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছিল। প্রমাণ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এ্যাপ্রোচের মাধ্যমে নবজাতকের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে এই গুণগত মান উন্নয়ন কার্যক্রম কাজ করেছে।

যেহেতু হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত শিশুর পরিমাণ বাড়ছে, কুড়িগ্রাম জেলা হাসপাতাল নতুন আরেকটি সেবা কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। কার্যক্রমটির লক্ষ্য হচ্ছে, বাচ্চা হওয়া থেকে শুরু করে বিশেষ সেবা ইউনিটে বাচ্চাকে স্থানান্তরের সময় পর্যন্ত কম ওজন নিয়ে জন্ম গ্রহণ করা বাচ্চাকে কীভাবে উষ্ঞ রাখা যায়, সে বিষয়টিতেই জোর দেয়া হয়। এর বাইরেও, কম ওজনের বাচ্চা ভূমিষ্ট হবার আগে থেকে ভূমিষ্ট হবার পর – এ দুয়ের তাপমাত্রা পরিমাপের তুলনামূলক পার্থক্য নির্ণয়ের পরিকল্পনা নেয় কার্যক্রম উন্নয়ন দলটি। স্বাস্থ্য সেবা প্রদান প্রক্রিয়ার সংশ্লিষ্ট ধাপগুলো বিশেষ করে জন্মগতভাবে কম ওজনের শিশুর স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে যথাযথ ধারণা পাবে হাসপাতালের স্টাফরা। #

 

 
Search:
For every child
Health, Education, Equality, Protection
ADVANCE HUMANITY
Search: