গল্পসমূহ

গোলক ধাঁধায় জীবন

সামিন সাবাবা

বাংলাদেশে বালুখালি ক্যাম্পে আসার পর থেকেই সুলতান আহমেদ প্রায়ই পথ হারিয়ে ফেলছে। এক সময়ে যে পাহাড় ছিল ঘন অরণ্যের আবাসস্থল, সেখানে মাটি কেটে তৈরি করা হাজার হাজার আশ্রয়কেন্দ্রের একটিই তার।

মিয়ানমার থেকে আসা ১৫ বছর বয়সী এই রোহিঙ্গা শিশুর কাছে গোলক ধাঁধার মতো পাহাড় বেয়ে ওঠা-নামার এই পথ দিয়ে চলাফেরা অসম্ভব মনে হয়। তাই সে শুধু জঙ্গলে যায় আগুন জ্বালানোর কাঠ সংগ্রহের জন্য।

অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে ইউনিসেফ পরিচালিত একটি শিশু-বান্ধব কেন্দ্রের মেঝেতে অভিভূত দৃষ্টিতে সে বসে ছিল। সে এই কেন্দ্রে আসার পথটি চেনে, কারণ এর কাঠামোটি আশপাশের অন্য কাঠামোগুলো থেকে আলাদা।

ছোট পাঁচ ভাইবোনের দু’জনকে সে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল এখানে। তাদের বাবা-মা দু’জনকেই মিয়ানমারে হত্যা করা হয়, যা সুলতানকে তার ঘরের প্রধান ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।

বড় বড় চোখের সেই অভিব্যক্তি নিয়েই সুলতান বলতে থাকে, “আমার এক চাচী আছেন, যাকে অনুসরণ করে আমরা এখানে এসেছি। তবে তার নিজেরই চারটি ছেলেমেয়ে রয়েছে। আমাদের এক চাচাও আছেন, তবে তিনি নতুন বিয়ে করেছেন এবং তার ঘরটিও আলাদা। তারা দীর্ঘদিন আমাদের দেখাশোনা করবেন না।”

সে জানায়, তার পরিবারটি বেঁচে আছে ত্রাণের ওপর।

ক্যাম্পের অনেক শরণার্থী মহাসড়কের পাশে ছোট ছোট দোকান দিয়েছে, যেখানে তারা জ্বালানি কাঠ বিক্রি করে। তবে সুলতান জানে না কীভাবে তারা এটা করে, “এখানে আমার কোনো বন্ধু নেই। আমি এমন কাউকে চিনি না যে আমাকে আশপাশ ঘুরিয়ে দেখাতে পারে।”

তবে সে সবসময় এমন অসহায় ছিল না। রাখাইনের কোয়াইসিয়াং খালের কাছে তাদের জেলেপাড়ায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযান শুরুর আগে পরিবারকে সাহায্য করেই কাটতো তার পুরো দিন।
সুলতান জানায়, রাখাইনে থাকা অবস্থায় সে ঘুম থেকে উঠে তাদের পাঁচটি গরু মাঠে নিয়ে যেত। সন্ধ্যায় সে গরুগুলো নিয়ে বাড়ি ফেরার পর খালে মাছ ধরতে যেত। তার দায়িত্ব ছিল পরিবারের খাওয়ার জন্য মাছ ধরা। সাত বছর বয়স থেকেই এই রুটিন অনুসরণ করে আসছিল সে।

পরিবারের মূল উপার্জনকারী ছিল তার বাবা। বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি মাছ বিক্রি করতেন। তবে ঈদুল আজহার একদিন আগে অন্য আরও নয়জন লোকের সঙ্গে বেঁধে তাকেও নিয়ে যায় সৈন্যরা।
“পরদিন, ঈদের দিন, আমরা আমাদের এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে একটি ফোন পাই, যিনি ত্রাণ আনার জন্য নিকটবর্তী একটি গ্রামে গিয়েছিলেন। তিনি জানান, মাটিতে একটি গর্ত খুড়ে সেখানে স্তূপ করে রাখা অনেক মৃতদেহের মাঝে আমার বাবার মৃতদেহও দেখেছেন তিনি। সৈন্যরা গর্তটি মাটি দিয়ে ভরছিল। তারা গলা কেটে আমার বাবাকে হত্যা করে।”

এরপরই সুলতানের পরিবার পালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। “আমরা আমাদের গরুগুলো ছেড়ে দেই। আমাদের পরিচিত এমন কেউ ছিল না যে তারা গরুগুলো কিনবে। এরপর আমরা সীমান্ত অভিমূখে হাঁটতে শুরু করি।

এক পর্যায়ে পরিবারটি ‘শকুলারদ্বীপ’ নামের একটি স্থানে পৌঁছায়, যা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারকে বিভক্ত করা নাফ নদীর দিকে যাওয়ার পথে একটি দ্বীপ।

কিন্তু তাদের পেছনে পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে থাকা মিয়ানমারের সৈন্যরা তাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালালে সুলতানের মাসহ অনেকে মারা যায়।

নিজের ভাবনায় হারিয়ে যাওয়া শিশুটি বলতে থাকে, “আমরা নিজেরাই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করি এবং তার পরনে যে পোশাক ছিল সেই পোশাকেই অগভীর একটি গর্তে তাকে দাফন করি।”

“আমার মায়ের আট গ্রাম ওজনের স্বর্ণালঙ্কার ছিল। এখানে আসতে গিয়ে তার সবই শেষ হয়ে গেছে। আমাদের গ্রাম থেকে রওয়ানা হওয়ার আটদিন পর আমরা এখানে এসে পৌঁছাই।”

তার ছোট ভাই প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি একটি খেলনা গরু নিয়ে খেলছিল। দামি কিছুর মালিক হতে হয়তো তাদের অনেক সময় লেগে যাবে। সুলতান বলতে থাকে, “যখন জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে হয় না তখন আমি আমার ছোট দুই ভাই ও তিন বোনের সঙ্গে খেলাধুলা করে সময় কাটাই।”

“এখানে আমি মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আমার এখন অফুরন্ত সময়। আমার কোনো কাজ খুঁজে বের করা উচিত, কিন্তু আমি এখানে আমার পথই খুঁজে পাই না।”
##

 
Search:
For every child
Health, Education, Equality, Protection
ADVANCE HUMANITY
Search: