গল্পসমূহ

‘কিশোর অপরাধ’ – কারণ ও প্রতিকার

ফারিয়া সেলিম

“আমি যখন স্কুলে ভর্তি হই, আমার শিক্ষকরা আমাকে স্কুলড্রেস বানাতে বলত। কিন্তু দারিদ্রের কারণে আমি স্কুলড্রেস বানাতে পারি নাই। আমার খুব খারাপ লেগেছিল। তাই আমি বন্ধুদের প্ররোচনায় চুরি করি”, বলছিলো মেহেদি, ১৫।

বাংলাদেশ আরও অনেক কিশোর-কিশোরীই আছে যারা মেহেদির মতো বিভিন্ন কারণে অল্প বয়স থেকেই নানা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে বা তার শিকার হয়। বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী যেসব কাজ অপরাধ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে সেসব কাজের সাথে ৯-১৮ বছর বয়সের কেউ জড়িত থাকলেই বা তার শিকার হলেই সেটা ‘কিশোর অপরাধ’।

কিশোর-কিশোরীরা কেন ও কি ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে?

“কোন শিশুই অপরাধী হয়ে জন্মগ্রহন করে না” বলেন জাস্টিস ঈমান আলী, “অনেক ক্ষেত্রেই তারা এ পরিস্থিতির শিকার হয় তাদের মা-বাবা, এলাকাবাসী ও শাসন ব্যাবস্থার জন্যে । কারণ আমরা প্রায়ই তাদের প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারি না।”

কিশোর অপরাধ অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। এর মধ্যে মুখ্য হচ্ছে কিশোরকিশোরীদের পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, অভিভাবকের সচেতনতা ও প্রকৃত তত্ত্বাবধান, পারিবারিক বন্ধন ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব, তাদের বন্ধুবান্ধবের প্রভাব, কিশোরকিশোরীদের বেড়ে ওঠায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা, শিক্ষা ব্যাবস্থা এবং সর্বোপরি সমাজ ও পরিবেশ যেখানে তারা বেড়ে উঠে।

“বাংলাদেশের আর্থ–সামাজিক প্রেক্ষাপটে, দরিদ্র পরিবারগুলোতে ছেলেমেয়ের বয়স ১০ বছর হলেই অভিভাবকরা মনে করেন তাদের সন্তান এখন উপার্জন করবে এবং সংসারের দায়িত্ব নেবে। উপার্জনের জন্যে পারিবারিক চাপই অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করে, কিংবা তারা অপরাধের শিকার হয়,” বলেন এডভোকেট সালমা আলী, চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন ল’ইয়ারস’ এ্যাসোসিয়েশন  ।

অধিকাংশ ছেলেমেয়েই যারা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে, তারা পরিস্থিতির শিকার। সঙ্গদোষে অনেক কিশোরকিশোরীই বখে যায়, এমনকি মাদক সেবনও করে। অনেক কিশোরীরা তাদের কিশোর সহপাঠী বা এলাকার সমবয়সী কিশোরদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকারও হয়।

আবার পারিবারিক দারিদ্র ও অভিভাবকহিনতার সুযোগ নিয়ে অনেক কুচক্রী দল তাদের চুরি, মাদকসেবন, মাদক ব্যাবসা সহ নানারকম অপরাধমুলক কাজে নিয়োজিত করে। কম বয়সের কারণে এসব ছেলেমেয়ে অনেকক্ষেত্রে বুঝতেও পারে না তারা কি করছে। এছাড়া শিশুদের বিচার সহজ বা তারা সহজে ছাড়া পাবে এই ধারনা থেকেও অনেকে তাদের অপরাধে লিপ্ত করে।

সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কিশোরকিশোরীরা যেমন আর্থ -সামাজিক চাপে অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে, তেমনি সচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরাও কম বেশী পারিবারিক সচেতনতা, উশৃঙ্খল জীবন এবং বন্ধুবান্ধবের প্ররোচনায় অপরাধ বা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে।

অপরাধ থেকে উত্তরনে কার দায়িত্ব কি?

“একটি শিশু-বান্ধব পরিবেশই কিশোর অপরাধ রোধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে,” বলে মনে করেন এডভোকেট সালমা আলী।

কিশোরকিশোরীরা যাতে অপরাধের সাথে জড়িয়ে না পড়ে তার জন্যে অভিভাবক বিশেষ করে মা-বাবার সচেতনতা ও সতর্কতা খুবই গুরুত্তপূর্ণ । একটি সুন্দর পারিবারিক আবহে ও ভালোবাসায় কিশোরকিশোরীদের বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের সমস্যা কি সেটা জানতে ও বুঝতে হবে, তাদের সাথে বন্ধুত্বমূলক সম্পরক গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা কোন অনৈতিক বা অপরাধমুলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে।

পরিবারের পাশাপাশি সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও কম নয়। স্কুলগুলোতে নৈতিক শিক্ষাসহ, জীবনদক্ষতা মূলক শিক্ষা, আচারআচরনগত শিক্ষা, শিশুরা যাতে স্কুল থেকে ঝরে না পড়ে সে দিকে লক্ষ্য রাখা, লেখাপড়ার পাশাপাশি তাদের অন্যান্য মানবিক বিকাশমুলক কর্মকাণ্ডে উদবুদ্ধ করা ও তার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া সবই গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া, শিশু যে এলাকায় বেড়ে ওঠে সে এলাকাতেও শিশুর প্রতি যত্নশীল ও অংশীদারিত্তমূলক একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সকল অভিভাবক এলাকার সকল শিশুদের সুযোগ সুবিধার প্রতি সমান নজর দেবেন।

শিশুদের উন্নয়নের জন্যে সরকারের অনেক নীতি আছে, তবুও তাদের জন্যে সুযোগ সুবিধা সৃষ্টির উদ্যোগ এখনও অনেক কম। সে বিষয়গুলোতেও যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে হবে।  শিশুরাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ, এই মুলমন্ত্র অন্তরে ধারন করে সকলকেই সে লক্ষে নিজের অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।

 
Search:
For every child
Health, Education, Equality, Protection
ADVANCE HUMANITY
Search: